প্রকাশিত:
২৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬:৩৪
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি স্তরকে নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার আলোকে পরিচালনার দিকনির্দেশনা দেয়। ইসলামের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো সত্যবাদিতা। সত্য কেবল একটি নৈতিক গুণ নয়; বরং এটি ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর বিপরীতে মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা এবং জেনেশুনে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়, বিশেষ করে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ থেকে জনগণের কাছে দেওয়া অবাস্তব ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতির বিষয়টি শরিয়তের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুতর গুনাহ হিসেবে বিবেচিত।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বারবার সত্য বলার নির্দেশ দিয়েছেন এবং মিথ্যাবাদীদের কঠোরভাবে নিন্দা করেছেন। আল্লাহ বলেন,
“হে মুমিনরা! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।”
—(সুরা তাওবা, আয়াত: ১১৯)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে সত্যবাদিতা কেবল ব্যক্তিগত গুণ নয়; বরং এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। যেহেতু রাজনীতি সমাজ পরিচালনার অন্যতম প্রধান মাধ্যম, তাই সেখানে সত্যের গুরুত্ব আরও বেশি।
আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“মিথ্যা রটনা তো তারাই করে, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহে বিশ্বাস করে না।”
—(সুরা নাহল, আয়াত: ১০৫)
এ থেকে স্পষ্ট হয়, মিথ্যা বলা ঈমানের দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ।
ইসলামে প্রতিশ্রুতি দেওয়া ও তা রক্ষা করা আমানতের মর্যাদা রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“আর তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
—(সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত: ৩৪)
নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক নেতারা জনগণের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দেন, তা নিছক কথার কথা নয়; বরং একটি অঙ্গীকার, যার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে জবাবদিহি করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মিথ্যা বলা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাকে মুনাফিকির সুস্পষ্ট আলামত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,
“মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, প্রতিশ্রুতি দিলে ভঙ্গ করে এবং আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে।”
—(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪)
নির্বাচনের আগে জেনেশুনে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া একজন মুসলিমের চরিত্রের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“যে ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করল, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
—(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৪)
ভোট লাভের উদ্দেশ্যে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া নিঃসন্দেহে প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত।
ইসলামে নেতৃত্ব কোনো সম্মান বা ভোগের বস্তু নয়; বরং এটি একটি কঠিন দায়িত্ব ও আমানত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,
“তোমরা নেতৃত্বের লোভ করবে। কিন্তু কিয়ামতের দিন তা অনুতাপের কারণ হবে।”
—(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭১৪৮)
অতএব, নেতৃত্ব অর্জনের জন্য যদি কেউ মিথ্যা আশ্বাস দেয়, তবে সে পরকালে লজ্জিত হবে।
মিথ্যা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি শুধু ব্যক্তিগত গুনাহ নয়; এর ফলে সমাজে গভীর ক্ষতি সৃষ্টি হয়। যেমন—
জনগণের আস্থা নষ্ট হয়
ন্যায় ও ইনসাফের পরিবর্তে প্রতারণার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে
সমাজে হতাশা ও অবিশ্বাস বাড়ে
রাজনীতিকে গুনাহের পেশা হিসেবে দেখা শুরু হয়
ইসলাম কখনোই এমন সমাজব্যবস্থা সমর্থন করে না, যেখানে মিথ্যা ও প্রতারণা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়।
যদি কোনো রাজনৈতিক নেতা জেনেশুনে, বাস্তব সক্ষমতা বা সদিচ্ছা ছাড়া জনগণের আস্থা অর্জন ও ভোট পাওয়ার জন্য প্রতিশ্রুতি দেন, তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে তা স্পষ্টভাবে হারাম। কারণ এতে মিথ্যা, প্রতারণা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও আমানতের খিয়ানত—সবগুলো গুনাহ একত্রিত হয়।
তবে কেউ যদি আন্তরিক নিয়ত ও বাস্তব সক্ষমতার ভিত্তিতে প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু অনিচ্ছাকৃত কারণে তা পূরণ করতে না পারেন, তাহলে তিনি গুনাহগার হবেন না।
একজন মুসলিম রাজনীতিবিদের উচিত কম কথা বলা, কিন্তু সত্য বলা; কম প্রতিশ্রুতি দেওয়া, কিন্তু তা রক্ষা করা। ইসলাম এমন নেতৃত্বই প্রত্যাশা করে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সত্যের ওপর অবিচল থাকার এবং আমানত যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
মন্তব্য করুন: