প্রকাশিত:
১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:০০
পুরান ঢাকার অলিগলি ঘিরে গড়ে উঠেছে অবৈধ পলিথিন উৎপাদন ও সরবরাহের একটি সুসংগঠিত এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। চকবাজার, ইসলামবাগ, কামরাঙ্গীরচর ও লালবাগ এলাকায় বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় শতাধিক অবৈধ পলিথিন কারখানা। এসব কারখানায় প্রতিদিন উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ পলিথিন একটি নির্দিষ্ট পরিবহন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ঢাকাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, চকবাজারের ইমামগঞ্জ এলাকা অবৈধ পলিথিন সরবরাহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। দেবীদাস ঘাট ও সুয়ারীঘাট মাছ বাজারসংলগ্ন এলাকা ব্যবহার করে কন্টেইনার, কাভার্ড ভ্যান ও ট্রাকে করে পলিথিন দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। এই কাজে যুক্ত রয়েছে অসংখ্য বড় ও ছোট পরিবহন প্রতিষ্ঠান।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পুরো পলিথিন সরবরাহব্যবস্থা কার্যত দুটি বড় পরিবহন সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে সরবরাহ হওয়া অবৈধ পলিথিনের বড় অংশই এই চ্যানেল ব্যবহার করে যায়। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর কন্টেইনার বুকিং শুরু হয় এবং গভীর রাতে লোডিং সম্পন্ন করে ভোরের আগেই পণ্য পাঠানো হয়। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে এই নেটওয়ার্ক কার্যত একটি সমান্তরাল অবৈধ লজিস্টিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক ‘ম্যানেজমেন্টের’ কারণে এই সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে নির্বিঘ্নে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন, তবুও মাঠপর্যায়ে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থা আগের মতোই সক্রিয় রয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, গভীর রাতে চকবাজার ও আশপাশের এলাকায় সারি সারি ট্রাক, কন্টেইনার ও কাভার্ড ভ্যানে পলিথিন লোড করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রথমে পলিথিন লুকিয়ে ভরা হয়, পরে তার ওপর অন্যান্য পণ্য তোলা হয়—যাতে চেকপোস্টে ধরা না পড়ে। এলাকাজুড়ে রয়েছে নিজস্ব পাহারাব্যবস্থা। অপরিচিত কাউকে দেখলেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, যা সিন্ডিকেটের শক্ত নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ দেয়।
স্থানীয় শ্রমিক ও ভ্যানচালকদের দাবি, পুরান ঢাকায় ছয় থেকে সাত শতাধিক কারখানা থেকে প্রতিদিন কয়েকশ কোটি টাকার পলিথিন সারা দেশে সরবরাহ হয়। এই ব্যবসার বড় অংশ নগদে পরিচালিত হওয়ায় সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং কালো টাকার প্রবাহ বাড়ছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কিছু এলাকায় একই ভবনে পলিথিনের পাশাপাশি খাদ্যপণ্য উৎপাদনের ঘটনাও রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ। বড় কারখানাগুলোতে একাধিক অটো মেশিন ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে। গড়ে প্রতিটি কারখানা প্রতিদিন শতাধিক বস্তা পলিথিন উৎপাদন করে।
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী পলিথিন উৎপাদন ও বিপণন শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও বাস্তবে অভিযানে গ্রেপ্তার হন শ্রমিক বা পরিবহনকর্মীরা। মূল কারখানা মালিক ও পরিবহন সিন্ডিকেটের কর্ণধাররা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পরিবেশবাদী ও সুশীল সমাজ।
সম্প্রতি এক অভিযানে পলিথিন জব্দ হলেও মামলার আওতায় আনা হয়নি মূল হোতাদের। ফলে আইনের কার্যকারিতা নিয়েই তৈরি হয়েছে জনমনে সংশয়।
পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, জনবল ও নিরাপত্তা সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি নির্বাচনকালীন পরিস্থিতির কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সমন্বিত ও কঠোর অভিযান চালানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তারা।
মন্তব্য করুন: