প্রকাশিত:
৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১৭:১৪
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) চাঞ্চল্যকর এক ঘটনার তদন্ত শেষে বাকলিয়া থানাধীন নতুনব্রিজ পুলিশ চেকপোস্টে ১ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার সংক্রান্ত অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগে মোট আট পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে।বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আছেন বাকলিয়া থানার এসআই মোহাম্মদ আল-আমিন সরকার; বর্তমানে কোতোয়ালী থানায় কর্মরত এসআই মোহাম্মদ আমির হোসেন;এএসআই সাইফুল আলম;এএসআই মো. জিয়াউর রহমান; এএসআই মো. সাদ্দাম হোসেন;এএসআই এনামুল হক; কনস্টেবল মো. রাশেদুল হাসান ভূঞা এবং নারী কনস্টেবল উম্মে হাবিবা স্বপ্না।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের দক্ষিণ জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার ও সদ্য অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়ার স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে বরখাস্তের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা হয়েছে।অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, বরখাস্তের পেছনে মূল কারণ হিসেবে মাদকদ্রব্য আত্মসাৎ, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান এবং বৈধ আদেশ অমান্য করা। বরখাস্তের সময় বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্যদের দামপাড়া পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করে নিয়মিত হাজিরা এবং রোলকল নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে ৮ ডিসেম্বর রাতে। কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী দেশ ট্রাভেলসের একটি এসি বাস (ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-১৬৪২) নতুনব্রিজ চেকপোস্টে তল্লাশি করা হয়।এ সময় কক্সবাজার জেলা পুলিশের কনস্টেবল মো. ইমতিয়াজ হোসেনের সঙ্গে থাকা একটি ট্রলি ব্যাগ থেকে আনুমানিক ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়।তবে অভিযোগ ওঠে, উদ্ধারকৃত ইয়াবা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্যরা আত্মসাৎ করেন এবং রাত আনুমানিক ৩টা ৩০ মিনিটে কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তদন্তে উঠে আসে,কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার কয়েকজনের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে ইয়াবার চালান বহনে সম্মত হন। তিনি কোনো ছুটি না নিয়ে ইয়াবা ভর্তি লাগেজসহ ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন।এই সময়ে কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন পুলিশের অন্য সদস্যদের কাছে ‘সেফ এক্সিট’ চেয়ে অনুনয় করেন।পরে উদ্ধারকৃত ইয়াবার একটি অংশ বের করে নেওয়া হলেও পুরো চালান পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়নি এবং শুধুমাত্র ব্যাগটি ফেরত দেওয়া হয়। তদন্তে আরও জানা যায়, বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্যরা ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন।
তবে কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনের স্বীকারোক্তি, বাসের সুপারভাইজারের বক্তব্য এবং কয়েকজন পুলিশ সদস্যের জবানবন্দি পুরো ঘটনার প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ওয়াহিদুল হক চৌধুরীর পাঠানো অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্যরা সংঘবদ্ধভাবে গুরুতর অনিয়ম,শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং মাদকদ্রব্য আত্মসাতে জড়িত ছিলেন।
প্রতিবেদনে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় সর্বোচ্চ শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে।প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনার তদন্তে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা সিসিটিভি ফুটেজ,বাস সুপারভাইজারের তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণাদি বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করেছেন যে,পুলিশের এই অংশগ্রহণ না করা বা দায়িত্ব অমান্য করা কার্যক্রমের মাধ্যমে আইনের শৃঙ্খলা বিপন্ন হয়েছে।
সিএমপি প্রশাসন জানিয়েছে, বরখাস্তকৃত পুলিশ সদস্যদের সাময়িকভাবে দামপাড়া পুলিশ লাইনে সংযুক্ত রাখা হয়েছে এবং নিয়মিত হাজিরা,রোলকলসহ বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত রাখা হবে। এছাড়া তারা নতুন কোনো দায়িত্বে নিযুক্ত হবেন না এবং তদন্ত শেষে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে। চট্টগ্রামের সাধারণ জনগণ এই ঘটনায় উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেছেন এবং পুলিশের ভিতরেকার অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে আরও স্বচ্ছতা দাবি করেছেন।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে,এমন কেলেঙ্কারির পুনরাবৃত্তি রোধ করার জন্য ভবিষ্যতে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সকল চেকপোস্টে পর্যাপ্ত তদারকি,সিসিটিভি মনিটরিং ও সতর্কতা জোরদার করা হবে।পুলিশ সূত্রে জানা গেছে,বরখাস্তকৃত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং তদন্ত শেষে সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর করা হবে,যাতে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা বজায় থাকে এবং মাদক চক্রের সঙ্গে পুলিশের কোনও সম্পর্ক না থাকে।
মন্তব্য করুন: