প্রকাশিত:
২০ অক্টোবর ২০২৫, ১৭:১৮
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) হিসাব বিভাগের প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্দেশ এসেছে দুই সপ্তাহ আগে। কিন্তু তাতে টনক নড়েনি চসিক প্রশাসনের। এখনও পর্যন্ত বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়া শুরুই হয়নি।
৬ অক্টোবর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি কর্পোরেশন ২ শাখা থেকে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে হিসাব বিভাগের তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
চিঠিতে বলা হয়, জাইকা প্রকল্পের আওতায় সোনালী ব্যাংকের সিরাজউদ্দৌলা রোড শাখায় পরিচালিত একটি হিসাব থেকে (হিসাব নং০১০১৮৩৬০০০১০৩) চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের অনুকূলে জামানতের অর্থ জমা দেওয়ার জন্য ইস্যুকরা চেক চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের অনুকূলে (হিসাব নং- ০২০০০০৮৬১৩৮১৯) জমা না করে ভাউচার পরিবর্তন করে ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৩ হাজার ৫২৭ টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের বাণিজ্যিক এলাকা কর্পোরেট শাখা, আগ্রাবাদের তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা দায়ের করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের ছাড়াও অর্থ আত্মসাতে জড়িত আরও এক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।
এ ছাড়া অপরাধ সংঘটনের সময় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে অগ্রণী ব্যাংকের আরও একজন কর্মকর্তা এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের হিসাব বিভাগের তিন কর্মকর্তা/কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে দুদক।
দুদকের ওই পত্রের ভিত্তিতেই স্থানীয় সরকার বিভাগ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয় চসিককে। কিন্তু দুই সপ্তাহ পার হলেও চসিক কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মো. ফিরোজ মাহমুদের স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক বিষয়টি দ্রুততম সময়ের মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন ও স্থানীয় সরকার বিভাগকে জানাতে হবে।
দুদকের ২০২৪ সালের ১৩ জুনের পত্রের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সেই অভিযোগপত্রে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা আত্মসাৎ ঘটনার সময় দায়িত্বে অবহেলার কারণে চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির চৌধুরী, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (বিল) আশুতোষ দে ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (বাজেট) মাসুদুল ইসলাম এর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে দুদক।
একবছরের বেশি সময় আগে দুদকের অভিযোগপত্রে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে অভিযুক্ত থাকার পরও গত ২৯ সেপ্টেম্বর চসিকের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির চৌধুরীকে। পদোন্নতির আদেশে স্বাক্ষর করেন চসিক সচিব (ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা) মোহাম্মদ আশরাফুল আমীন।
তবে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সমালোচনার মুখে পড়ে চসিক প্রশাসন। পদোন্নতির এক সপ্তাহ পেরোনোর আগেই ৫ অক্টোবর মেয়রের অনুমোদনে সেই পদোন্নতির আদেশ বাতিল করা হয়।
একই দিনে দুদকের অভিযোগপত্রে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করার বিষয়ে প্রাপ্ত অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করার জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে চসিকের আইন কর্মকর্তা মহিউদ্দিন মুরাদকে নিয়োগ করা হয়। সাত কর্মদিবসের তদন্তপূর্বক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেয়া হয়। তবে সাত কর্মদিবস পেরিয়ে গেলেও সে তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ সম্পর্কে জানতে চসিক সচিব (ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা) মোহাম্মদ আশরাফুল আমীনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বিভাগীয় মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে আইন কর্মকর্তাকে নিয়োগ করা হয়েছে।
তবে বিভাগীয় ব্যবস্থার প্রক্রিয়া এবং স্বপদে বহাল রেখে তদন্ত করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ মতামত দেয়ার জন্য আইন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সাত কর্মদিবস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল আলোর মুখ না দেখার বিষয়ে তিনি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তার আত্মীয়র মৃত্যুর কারণে ছুটিতে ছিলেন তাই সাত কর্মদিবসে তদন্ত প্রতিবেদন এখনও দাখিল করতে পারেননি। তার আইনগত নির্দেশনার প্রয়োজন রয়েছে।
চসিক সচিব (ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা) মোহাম্মদ আশরাফুল আমীন বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বললেও অনুসন্ধান বলছে দুদকের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত
কর্মকর্তা হিসেবে আইন কর্মকর্তাকে নিয়োগ করা হয়েছে গত ৫ অক্টোবর এক অফিস আদেশের মাধ্যমে।
তবে ৬ অক্টোবর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি কর্পোরেশন ২ শাখার নির্দেশনা
অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি চসিক সচিব (ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা) মোহাম্মদ আশরাফুল আমীন।
আইন কর্মকর্তা ছুটিতে থাকায় তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পারননি বলা হলেও চসিক সূত্র বলছে তিনি মাত্র দুইদিন ছুটিতে ছিলেন। সে দুইদিন বাদ দিয়েও ইতোমধ্যে আট কর্মদিবস অতিবাহিত হয়েছে।
চসিক সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ছত্রচ্ছায়ায় বিষয়টি ‘ঠান্ডা’ রাখার চেষ্টা চলছে। তাছাড়া মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নির্দেশ উপেক্ষা করা প্রশাসনিক গাফিলতি ছাড়া কিছু নয়। এতে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট দফতরের নীরবতা দেখা গেছে বলেও জানায় চসিক সূত্র।
মন্তব্য করুন: