প্রকাশিত:
৯ অক্টোবর ২০২৫, ১৪:৪১
শিশু অধিকার সপ্তাহ শিশুদের অধিকার, সুরক্ষা এবং মর্যাদা নিয়ে সচেতনতা তৈরির জাতীয় সপ্তাহ। এই বছর ৮ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত “শিশুর কথা শুনবো আজ, শিশুর জন্য করবো কাজ” এই প্রতিপাদ্য নিয়ে উদযাপিত হচ্ছে শিশু অধিকার সপ্তাহ। এই উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুস বলেন, “চলুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি—প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ শৈশব, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক বিকাশের পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করব।”
এই প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক গুরুত্বপূর্ণ সত্য— আমাদের শিশুদের নিরাপত্তা, বিকাশ এবং মানসিক সুস্থতা আমাদের দেশ ও সমাজের ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবতা কি তাই? আমাদের শিশুরা কি সত্যিই নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং সুরক্ষিত পরিবেশে বেড়ে উঠছে?
সম্প্রতি সুনামগঞ্জে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক ঘটনা। মাত্র ১১ বছর বয়সী এক শিশু স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাকে ধর্ষনের চেষ্টা করা হল। রাত আটটায় ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরার পথে একই গ্রামের এক ব্যক্তি তাকে আক্রমণ করার চেষ্টা করে। শিশুটি ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও, মানসিক ক্ষতি চিরকালই তার সঙ্গে থেকে যাবে । এই শিশুটি বেঁচে গেলেও দেশের অধিকাংশ শিশুরা এমন যাত্রায় বেচেঁ ফেরে না।
লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (লিডো) জানিয়েছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে শিশু ধর্ষণের হার ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি শুধু সংখ্যা নয়— এটি আমাদের শিশু সুরক্ষার নীরব সংকটের চিত্র তুলে ধরে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র পরিষ্কার কিছু তথ্য তুলে ধরে। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৩০৬ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।২০২৪ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১৭৫। অর্থাৎ মাত্র সাত মাসেই গত বছরের চেয়ে বেশি শিশু আক্রমনের শিকার হয়েছে।এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়— এটি প্রতিটি শিশুর স্বপ্নহীন শৈশব, হারানো হাসি, এবং গভীর এক ট্রমার প্রতিফলন।
এমন ভয়ংকর অভিজ্ঞতা কোমলমতি শিশ্দের শারীরিক ও মানসিক এক ভয়াবহ প্রভাবের সৃষ্টি করে। দক্ষিণ কোরিয়ার ডানকুক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, যৌন নির্যাতনের শিকার ৯৭ জন শিশুর মধ্যে অধিকাংশই ভোগে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, মনোযোগের ঘাটতি, সামাজিক অপরিপক্বতা এবং আগ্রাসী আচরণে। এই মানসিক ক্ষতি শিশুদের সামাজিক, আবেগিক এবং আচরণগত বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তাদের আত্মবিশ্বাস, নিরাপত্তা বোধ এবং জীবনের স্বাভাবিক শিক্ষা প্রক্রিয়াও বিপর্যস্ত হয়।
অন্যদিকে, ইউনিসেফ জানিয়েছে— ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৯ জনই মাসে অন্তত একবার শারীরিক বা মানসিক সহিংসতার শিকার হয়।সহিংসতা কেবল বাহিরের ঘটনা নয়; অনেক সময়ই এটি শুরু হয় ঘর থেকে—যেখানে শিশুরা সবচেয়ে নিরাপদ থাকার আশা রাখে ।
অর্থনৈতিক দুর্বলতা, সামাজিক রীতিনীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে শিশুরা প্রায়শই সহিংসতা, শোষণ ও অবহেলার শিকার হয়। বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষা এবং শিশু অধিকারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুতর ও বহুমাত্রিক সমস্যা বিদ্যমান। যেমন, অধিকাংশ শিশুই পরিবার, স্কুল বা কর্মস্থলে শারীরিক শাস্তি বা মানসিক আগ্রাসনের শিকার হয়। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ। অর্ধেকেরও বেশি মেয়েদের ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়ে যায়। লাখ লাখ শিশু বিভিন্ন ধরনের শ্রমে নিয়োজিত, যার একটি বড় অংশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হয়। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুর জন্ম নিবন্ধন হয় না, যার ফলে তারা একটি পরিচয়ের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। লক্ষ লক্ষ শিশু গৃহহীন হয়ে রাস্তায় বসবাস করে, যারা আশ্রয়, খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকে মারাত্মকভাবে বঞ্চিত। শিশু সুরক্ষার জন্য আইন (শিশু আইন, ২০১৩; জাতীয় শিশু নীতি, ২০১১) এবং নীতি থাকলেও মাঠ পর্যায়ে সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগে দুর্বলতা রয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের হতদরিদ্র ও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জীবনমান উন্নয়ন এবং তাদের অধিকার ও সুরক্ষার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ (UNCRC) বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন কর্ম কৌশল অবলম্বন করে, যার মূল লক্ষ্য হলো শিশুদের সকল প্রকার সহিংসতা, অপব্যবহার এবং শোষণ থেকে রক্ষা করা। তারা গ্রাম ও এলাকাভিত্তিক শিশু ফোরাম গঠনের মাধ্যমে শিশুদের নেতৃত্ব ও নিরাপত্তার জন্য মার্শাল আর্ট ট্রেনিং, শারীরিক শিক্ষা, ক্রিড়া কর্যকলাপের পাশাপাশি সামজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ও কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া মাদকবিরোধী, শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, এবং শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণ ও সরকারের সাথে পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তার বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত ওয়ার্ল্ড ভিশন স্থানীয় সরকারের সহযোগিতায় সারা বাংলাদেশে ৩৬১৮ টি গ্রাম, ১০৩ ইউনিয়ন, ০৩ টি পৌরসভা এবং ০৩ টি উপজেলাকে বাল্যবিবাহ মুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষনা করেছে।
কিন্তু শিশু সুরক্ষা শুধু সরকারের বা কোন একটি সংস্থার একার দেখার বিষয় নয়; এটি অভিভাবক, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নাগরিক সমাজের যৌথ দায়িত্ব।অভিভাবকদের উচিত শিশুদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা। তাদের প্রতি মনযোগ দেয়া এবং তাদের মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তনের দিকে নজর দেওয়া। এছাড়া। সকল শিক্ষা ও পরিচর্যা কেন্দ্রে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বিধান সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা সহ শিশু আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। শিশু অধিকার নিয়ে কর্মরত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় (মহিলা ও শিশু বিষয়ক, সমাজকল্যাণ, স্বরাষ্ট্র) এবং বিভাগের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে একটি কেন্দ্রীয় শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর বা শক্তিশালী সমন্বয় সেল স্থাপন করতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন করে তাদের সক্রিয় করা। এই কমিটিগুলো এলাকায় কোনো শিশু যেন সহিংসতা, বাল্যবিবাহ বা শ্রমের শিকার না হয়, তা পর্যবেক্ষণ করবে এবং স্থানীয় প্রশাসনকে জানাবে। স্থানীয় ও জাতীয় বাজেটে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখা এবং সেই অর্থের সদ্ব্যবহার হচ্ছে কিনা, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
শিশুদের জন্য টেকসই নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। শিশু অধিকার সপ্তাহ কেবল উদযাপনের নয়— এটি আমাদের প্রতিফলনের সময়। সমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে বার্তা— আমার সন্তান যেন থাকে "দুধে আর ভাতে" অর্থাৎ প্রতিটি শিশু যেন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির পাশাপাশি, নিরাপদ ও সুস্থ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে। এই শিশু অধিকার সপ্তাহে আমাদের অঙ্গীকার হোক প্রাণময় শিশুর শৈশব ও আগামী যা ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা বা আর্থ-সামাজিক অবস্থা নির্বিশেষে প্রতিটি শিশুর জন্য সমান সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিতে কাজ করবে।
লেখক:
স্ট্রালা রুপা মল্লিক
লিড-চাইল্ড প্রটেকশন, এডভোকেসি এন্ড সেইফগার্ডিং
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ।
মন্তব্য করুন: