প্রকাশিত:
৬ অক্টোবর ২০২৫, ১৮:৩৬
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেটের ৬টি আসনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ নির্বাচনী আসন হচ্ছে সিলেট-৪ আসন। এর আয়তন ১০৪৪ বর্গ কিলোমিটার। নির্বাচন অফিস (২০২৩ ডিসেম্বর) অনুযায়ী মোট ভোটার সংখ্যা ৪,৭৫,১২৩। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার সংখ্যা ২,৪৬,১১০ জন, নারী ভোটার সংখ্যা ২,২৯,০১২জন এবং হিজড়া ভোটার ১জন।
পর্যটন ও খনিজ সম্পদ অধ্যুষিত কোম্পানীগঞ্জ-গোয়াইনঘাট-জৈন্তাপুর উপজেলা নিয়ে ঘটিত আসনটি স্বাধীনতার পর থেকেই আওয়ামী লীগের ঘাটি হিসেবে পরিচিত। বিগত ১২টি সংসদ নির্বাচনের আওয়ামী লীগ ৯ বার, বিএনপি ২ বার ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ১ বার জয়ী হয়েছেন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণের সুযোগ থাকছে না। আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ২৩২ নং আসনটি অন্যান্য দলের প্রার্থীদের জন্য ভোট-ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধারণা করা যাচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের বৃহৎ দুই রাজনৈতিক দল জামায়াত ও বিএনপি সমর্থন আদায়ে সাধারণ ভোটারদের কাছে টানার জন্য সভা সেমিনার করে যাচ্ছে। জামায়াতের একক প্রার্থী মাঠে থাকলেও বিএনপিতে এখনো প্রার্থী নির্বাচন করতে পারেনি। যার কারনে একাধিক প্রার্থী বিভিন্ন গ্রুপে সম্ভাব্য এমপি পদপ্রার্থী হিসেবে মাঠ চষে বেড়াচ্ছে।
দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশি গোয়াইনঘাটের তিন বিএনপি নেতা মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এরা হচ্ছে গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির উপদেষ্টা আব্দুল হেকিম চৌধুরী, জেলা বিএনপির আরেক উপদেষ্টা হেলাল উদ্দিন আহমেদ ও সাবেক এমপি দিলাদার হোসেন সেলিম পত্নি এডভোকেট জেবুন্নাহার সেলিম। এছাড়াও কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতা সিদ্দিকি দীর্ঘদিন মাঠে রয়েছেন। সম্প্রিতি গুঞ্জন রটেছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ব্যক্তিগত আন্তর্জাতিক সম্পাদক প্রবাসী কমিউনিটি নেতা কবির আহমদ সিলেট-২ আসন ছেড়ে সিলেট-৪ এ টিকেট পেতে পারেন। যদিও তাকে হাইকমান্ড থেকে সিলেট-২ আসনে নির্বাচন করার গ্রীণ সিগনাল দিয়েছে। তবে সেখানে আরেক হ্যাভিওয়েট নেতা সাবেক এমপি ইলিয়াস পত্নি তাহসিনা রুশদীর লুনাকে সেই আসনটি ছাড় দিতে পারে কবির আহমদ। সেজন্যে তাকে সিলেট-৪ আসনে নির্বাচন করার ইঙ্গিত দিতে পারে বিএনপি নির্বাচনী কমান্ড। নির্বাচনী তফসিলে সময় ঘনিয়ে আসলেও সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে কাকে মনোনয়ন দিবে তা নিশ্চিত করতে পারেনি দলীয় কমান্ড। যার কারনে অনেকটা অগুছালোই দেখা যাচ্ছে বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণা। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামের একক প্রার্থী জয়নাল আবেদিন প্রায় এক বছর যাবত মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তিন উপজেলার সব কয়টি ইউনিয়নে প্রচার-প্রচারণা প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন শুধু নির্বাচনী আনুষ্ঠানিকতা বাকি।
জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে পুর্ণ সময় দায়িত্ব পালন করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১৪ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী মো. জয়নাল আবেদীন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী কামাল আহমদকে ৩৭৬৮ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হোন।জয়নালের আবেদিনের প্রাপ্ত ভোট ছিল ২৩ হাজার ৬১ ও তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী কামাল আহমদ পেয়েছিলেন ১৯ হাজার ৩৭৯ ভোট। উপজেলার জনপ্রতিনিধিত্ব পালন করা সিলেট মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি জয়নাল আবেদিন বিএনপির কোন নেতার বিরুদ্ধে লড়াই করবে তা এখনো নিশ্চিত নয়।
স্বাধীনতার পর ১৯৯৬ সালে প্রথমবার সিলেট-৪ আসন থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল জামায়াতে ইসলাম।
৬ষ্ট জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করেন। বিএনপির হ্যাভিওয়েট নেতা এম সাইফুর রহমানের কাছে পরাজিত হয়ে ৬ষ্ট স্থান ধরে রাখেন জামায়াতের আব্দুল মান্নান। তার প্রাপ্ত ভোট ৩,০৯৫ ভোট। নির্বাচনে সাইফুর রহমানের প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা ছিল ২৩,৯৪৬। বিগত ১২টি সংসদ নির্বাচনের তুলনায় আসন্ন সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৪ আসনে চালকের ভূমিকায় রয়েছে এ দলটি। তবে ভোটের মাঠে বড় ফ্যাক্টর আওয়ামী সমর্থক। কারন বিগত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ৯টিতেই জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ। যেহেতু নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণের সুযোগ থাকছে না সে ক্ষেত্রে মোট ভোটারদের বড় একটি অংশ তাদের পছন্দের দলীয় প্রার্থী পাচ্ছে না। সেই সুযোগটি কাজে লাগাতে চাইবে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলাম। শতাধিক আওয়ামী লীগ সমর্থকের সাথে আলাপকালে জানা যায়, আগস্টের পরবর্তি সময়ে তৃণমূল আওয়ামী লীগ ভোটারদের স্থানীয় বিএনপি নেতারা রাজনৈতিকভাবে চাপে রেখেছে। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মামলায় জর্জরিত আওয়ামী সমর্থকরা। অন্যদিকে সাম্প্রতিক বিএনপি অনেকটা বিতর্কিত হয়ে পড়েছে।
তাই তারা ইচ্ছে করেই বিএনপির বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার একটা প্রবণতা বেশি থাকছে। অন্যদিকে আওয়ামী ভোটাররা দুই ভাগে বিভক্ত। এক পক্ষ তরুণ ভোটার, অন্য পক্ষ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরা। ১১৭ জন তরুণ আওয়ামী ভোটারের সাথে কথা হয়েছে প্রতিবেদকের৷ তাদের পছন্দ জামায়াত। তাদের অধিকাংশের একই মন্তব্য, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের উপর অত্যাচার কম হবে। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য হচ্ছে, জামায়াত স্বাধীনতা বিরোধী দল। তাদের ভোট না দিয়ে প্রয়োজনে বিএনপিকে ভোট দিয়ে দেবো। তবে একাধিক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য ও তরুণ ভোটারদের অভিমত তারা ভোটদান থেকে বিরত থাকবে। তফসিল ঘোষণার পূর্বেই নির্বাচনী ঘোরসওয়ারি জামায়াত অন্যদিকে বিএনপির একাধিক নেতা ঘোড়ার চাবুক নিয়ে নিয়ে টানাটানি করছে। শেষমেষ বিএনপির ঘোরসওয়ারি কে হবেন তা সপ্তাহান্তেই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগরীর আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম নাগরিক সংবাদকে বলেন, যত সময় গড়াচ্ছে ভোটার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে জামায়াত সম্পর্কে ইতিবাচক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তাঁর মতে, মানুষ এখন পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছে এবং আগের মতো পরিস্থিতি চায় না। মানুষ এখন দল দেখে ভোট দিতে চায় না, ব্যক্তি দেখে ভোট দিতে চায়।
মন্তব্য করুন: