প্রকাশিত:
২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৮:১৫
চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যবাহী ট্রেন স্বল্পতায় আটকে থাকায় প্রায় দেড় হাজারটি কন্টেইনার পণ্য বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন আমদানিকারকরা। আগে যেখানে প্রতি মাসে ৯০ থেকে ১০০টি কার্গো ট্রেন চট্টগ্রাম থেকে কমলাপুর আসা-যাওয়া করত, গত তিন মাসে তা ৪০ থেকে ৪৫-এ নেমে এসেছে। পণ্য খালাসে বিলম্ব হওয়ায় আমদানিকারকরা এলসি খোলা কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে কাস্টমস হাউসজের রাজস্ব আদায় ব্যাপক হারে কমে যাচ্ছে।
আইসিডি, কমলাপুর ঢাকার একটি ব্যস্ততম রেল-ভিত্তিক কাস্টমস হাউস। ঢাকার বড় বড় ব্যবসায়ীরা এ হাউসের মাধ্যমে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করে থাকেন। ফলে বছরে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয় এখান থেকে।
সাধারণত চট্টগ্রাম বন্দরে আসা আমদানি পণ্যবাহী কন্টেইনারগুলো ২-৩ দিনের মধ্যে কমলাপুরে পৌঁছানোর কথা থাকলেও, গত চার মাসে এই সময়সীমা বেড়ে ১৫-৩০ দিন হয়ে গেছে। এ বিলম্বের কারণে শিল্প ইউনিট, আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, পরিবহন ঠিকাদার এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। সমস্যার সমাধানের জন্য ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (ডিসিএএ) গত ১৭ জুলাই রেলওয়ে মহাপরিচালককে একটি চিঠি দেয়। চিঠিতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কমলাপুরে কন্টেইনার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কাস্টমস হাউসটির স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পণ্য পরিবহনের জন্য তিনটি প্রধান পথ রয়েছে রেল, সড়ক এবং নৌ পথ যার মধ্যে রেল সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ মনে করেন আমদানিকারকরা। কিন্তু চলমান সংকটের কারণে ব্যাহত হওয়ায় এই রুট কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে তারা মনে করছেন।
ডিসিএএ-এর তথ্যমতে, মে মাসে কমলাপুরে ৬৩টি মালবাহী ট্রেন, জুনে ৪৬টি, জুলাইয়ে ৪১টি এবং চলতি মাসের প্রথম ২৮ দিনে ৪৮টি ট্রেন পৌঁছেছে। আগে প্রতি মাসে অন্তত ৯০-১০০টি ট্রেন আসত। চিঠিতে ডিসিএএ বলেছে, “বর্তমানে একটি কন্টেইনার ১৫-৩০ দিন পর কমলাপুরে পৌঁছাচ্ছে, যার কারণে শিল্প ইউনিট, আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, পরিবহন ঠিকাদার এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়েছে।”
তারা আরও বলেছে, যদি এই সমস্যা দ্রুত সমাধান না হয়, তবে সরকারের আইসিডি বন্দর প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য গুরুতরভাবে ব্যাহত হতে পারে।
ডিসিএএ-এর সভাপতি মিজানুর রহমান মিজান বলেন, “আমরা গত তিন মাস ধরে বিভিন্ন অফিসে গিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোনো কার্যকর ফলাফল পাইনি।”
কিছুদিন আগে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের সচিব কমলাপুরের আইসিডি পরিদর্শন করে দ্রুত সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেন। তবে এখনো সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।
পানগাঁও নৌবন্দর এবং আইসিডি, কমলাপুর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আওতাধীন। ঐতিহাসিকভাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এই বন্দরগুলো পরিচালনার জন্য অপারেটর নিয়োগ করে থাকে। কিন্তু আইসিডি, কমলাপুর বন্দরটি রেল কর্তৃপক্ষের অধীনে আনার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মনোযোগ ও অগ্রাধিকার আইসিডি থেকে সরে গেছে।
আইসিডি কাস্টমস হাউসটি রেল কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে গাজীপুরের ধীরাশ্রমে স্থানান্তরিত হচ্ছে। নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে এবং ৩-৪ বছরের মধ্যে একটি আধুনিক কাস্টমস হাউস ৪ লাখ টিইইউএস ধারণক্ষমতা নিয়ে চালু হবে। এটির কাজ শেষ হলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কাস্টমস হাউসের নিয়ন্ত্রণ হারাবে।
ডিসিএএ-এর সাধারণ সম্পাদক ফারুক আলম বলেন, “বন্দর আইন অনুযায়ী আমদানি পণ্য চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর পর প্রথম ৪ দিন বন্দর চার্জমুক্ত থাকে, তবে পঞ্চম দিনের পর চার্জ বসে। কিন্তু বর্তমানে এই নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে না এবং চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার আটকে থাকলেও চার্জ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। অথচ এসব পণ্যের শেষ গন্তব্য আইসিডি।”
কাস্টমস হাউসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সেবার মান সন্তোষজনক না হওয়ায় এলসি খোলার সংখ্যা কমে গেছে গাণীতিক হারে এবং এখন প্রতিদিন মাত্র ২০-২৫টি বিল অব এন্ট্রি জমা হচ্ছে, যা রাজস্ব সংগ্রহে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।”
মন্তব্য করুন: