প্রকাশিত:
২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৬:৫৩
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মেঘনা নদী থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের কারণে ভয়াবহ নদীভাঙন ও মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে আশুগঞ্জ নৌবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং তীরবর্তী জনবসতি হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র-সংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিন একসাথে ২০টিরও বেশি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে দিন-রাত বালু তোলা হচ্ছে। প্রশাসনের নির্ধারিত সীমানা অতিক্রম করে সরাসরি নদীর পাড় পর্যন্ত গিয়ে বালু তোলায় নদীর তলদেশের পাশাপাশি তীরও ভেঙে পড়ছে। ফলে কৃষিজমি, বসতভিটা, এমনকি চরসোনারামপুর গ্রামের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের বসতিও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষভাবে হুমকির মুখে পড়েছে চরসোনারামপুরের পাশে মেঘনার তীরে স্থাপিত জাতীয় গ্রিডের ২৩০ কেভি বিদ্যুতের রিভার ক্রসিং টাওয়ার। ইতোমধ্যেই এর নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে জাতীয় গ্রিডে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (পিজিসিবি) স্থানীয় কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আবু হানিফা জানান, রিভার ক্রসিং টাওয়ারের কাছে বালু উত্তোলন করা হলে টাওয়ারটি মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। এতে সারা দেশে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। এসব বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে লিখিতভাবে অবগত করা হয়েছে। একই মত দিয়েছেন পিজিসিবির নরসিংদী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুর কবির।
প্রশাসনিক সূত্র জানায়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ফোরলেন প্রকল্পে বালুর চাহিদা মেটাতে গত ২০ আগস্ট জেলা প্রশাসন তিন মাসের জন্য হিগো মীর আক্তারের প্রতিনিধি এ-টু-বি কর্পোরেশনকে বালু তোলার অনুমতি দেয়। তবে শর্তসাপেক্ষে নির্দিষ্ট সীমানা লাল নিশান দিয়ে চিহ্নিত করে দেওয়া হলেও তা অমান্য করে সীমা অতিক্রম করে চলছে বেপরোয়া বালু উত্তোলন। এতে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
চরসোনারামপুরের বাসিন্দা মো. ইব্রাহিম মোল্লা বলেন, “বেশ কয়েক বছর ধরে চরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর পাশে আবার বালু উত্তোলন করায় ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এতে প্রায় ছয় হাজার মানুষ গৃহহীন হবে। আমরা দ্রুত এভাবে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানাচ্ছি।”
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০২২ সালে তৎকালীন আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরবিন্দ বিশ্বাস নদী জরিপ করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিলেন— চরসোনারামপুর ও আশপাশের এলাকা থেকে বালু উত্তোলন হলে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড, আশুগঞ্জ বন্দর এলাকা, তীরবর্তী বাড়ি-ঘর ও কৃষিজমি নদীভাঙনের শিকার হবে। একই মত প্রকাশ করেছিল তৎকালীন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ও। এরপরও সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন মাসের জন্য বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
আশুগঞ্জ জেনারেল মার্চেন্ট অ্যান্ড কমিশন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. জহিরুল ইসলাম জারু বলেন, “এভাবে চলতে থাকলে শুধু তীরবর্তী গ্রাম নয়, আশুগঞ্জ বন্দরও হুমকির মুখে পড়বে। আমরা ইতিমধ্যে ইজারা বাতিলের আবেদন করেছি, প্রয়োজনে আদালতের দ্বারস্থ হব।”
অন্যদিকে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ-টু-বি কর্পোরেশনের স্থানীয় প্রতিনিধি কামাল হোসেন জয় দাবি করেন, তারা শর্ত মেনেই বালু তুলছেন। ভৈরবের একটি প্রভাবশালী মহল অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু তুলছে, যার দায় অন্যায়ভাবে তাদের ওপর চাপানো হচ্ছে।
এ বিষয়ে আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাফে মোহাম্মদ ছড়া বলেন, “ফোরলেন প্রকল্পের প্রয়োজনে তিন মাসের জন্য বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে সীমা অতিক্রম বা চুক্তিভঙ্গ হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ প্রসঙ্গে নদী ও প্রকৃতি সুরক্ষা সামাজিক আন্দোলন ‘তরী বাংলাদেশ’-এর আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, “আশুগঞ্জের বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল ও নৌবন্দর দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ নির্বিচারে বালু উত্তোলনের কারণে এ অঞ্চল মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। শুধু তা-ই নয়, নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত ড্রেজার ও অনিয়ন্ত্রিত বাল্কহেড চলাচলের ফলে দেশীয় মাছের প্রজনন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে এবং হুমকিতে পড়ছে জলজ জীববৈচিত্র্য। অবিলম্বে বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে আশুগঞ্জের বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল, মহাসড়ক ও হাজারো মানুষের বসতি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতেও মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।
মন্তব্য করুন: